রূপগঞ্জ আওয়ামী লীগে গ্রুপিং আর নিষ্ক্রিয় বিএনপি

0
149
রূপগঞ্জ আওয়ামী লীগে গ্রুপিং আর নিষ্ক্রিয় বিএনপি

নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডট নেট মো. হানিফ মোল্লা : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়াী লীগ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে দলকে চাঙ্গা রাখলেও উপজেলা বিএনপি এখন নিষ্ক্রিয়। রাজনীতির মাঠ গরম রাখতে আওয়ামী লীগের দুটি গ্র“পই পেশি শক্তি মহড়াসহ দলীয় কর্মসূচি পালন করছেন জমকালো ভাবে।

আওয়ামী লীগের একপক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতিক) আর অপরপক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান ভুঁইয়া। এদিকে, উপজেলা বিএনপিতে অভ্যান্তরীন কোন্দল ও সরকারি দলের হামলা, মামলার ভয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান রাজনীতি ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে দলকে সক্রিয় রাখতে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু সমর্থিত লোকজন অনেকটাই সক্রিয়। রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগের কার্যালয় ছাড়া বিএনপি, জামায়াত ইসলাম, জাতীয়পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ, ইসলামী আন্দোলনসহ সমমনা দলগুলোর কোনো কার্যালয়ও নেই।
আওয়ামী লীগ: স্থানীয় এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতিক), উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ শাহজাহান ভুঁইয়ার গ্র“পিং এখন প্রকাশ্যে। তবে উভয়পক্ষের মধ্যে দাঙ্গা, হাঙ্গামাও হয়েছে একাধিকবার। পেশি শক্তির মহড়া চলছে প্রতিনিয়ত। জনসমর্থনে গোলাম দস্তগীর গাজী গ্র“প বেশি শক্তিশালী। উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান ভুঁইয়ার বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর নামে নিজ দলের নেতাকর্মীকে হত্যা করেছেন এমন অভিযোগে মামলাও রয়েছে। ফলে এমপির বাইরের অংশটি কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন। তবে দলীয় গ্র“পিং থাকায় ৩ বছরের উপজেলা কমিটি দুই যুগেও কোনো সম্মেলন কিংবা কমিটির কোনো পরিবর্তন নেই। ফলে নেতৃত্বে আসতে পারছেন না অনেক সম্ভাবনাময়ী তরুণ। এরমধ্যে বেশ কয়েকজন পদ পাওয়া নেতার মৃত্যুতে শূণ্যপদের সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে খোদ ক্ষমতাসীন দলেই ক্ষোভ বিক্ষোভের অন্ত নেই।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতিক) বলেন, দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়ায় উপজেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে কিছুটা দুর্বল। তবে সরকারি অনুষ্ঠানসহ নিয়মিত সভা-সমাবেশ পালন হচ্ছে। আর গ্র“পিং সব দলেই আছে, থাকবে। তবে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও সহযোগি সংগঠনের কার্যলয় রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নবীন ও প্রবীন নেতা বলেন, রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ কমিটির কোনো কার্যকারিতা নেই। কমিটির কার্যকারিতা না থাকলে সংগঠন টিকে না, নেতা তৈরি হয় না। এমন অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন যারা নতুন কমিটি না হওয়ায় নেতৃত্বে আসতে পারছেন না। এবার শুনেছিলাম, সম্মেলন করে কমিটি হবে, কিন্তু একেক নেতা একেক দিকে। সবাই নিজের চিন্তায় ব্যস্ত।
আওয়ামী রাজনীতিতে গ্র“পিং থাকলেও তা প্রকট নয় দাবি করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ শাহজাহান ভুঁইয়া বলেন, আওয়ামী লীগ বড় দল, গ্র“পিং থাকবেই। সবাই দলের মনোনয়ন চায়। দলীয় সভা-সমাবেশে অনুপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, এটি সঠিক নয়, যারা এসব বলছে তারা কি পদে আছে? সেটা আগে দেখতে হবে। এছাড়াও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেতে পারেন বলে বাংলার প্রথম সেনাপ্রধান ও সাবেক এমপি মেজর জেনারেল (অব.) কেএম সফিউল্লাহ বীর উত্তম এর নামও শোনা যাচ্ছে।
বিএনপি: রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপি এখন তিনভাগে বিভক্ত হলেও দুটি গ্র“পই এখানে খুব একটা সক্রিয় নয়। কেন্দ্রিয় কর্মসূচিগুলোও পালন হয় দায়সারা গোছের। হামলা, মামলা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার ত্যাগী কর্মীরা এখন উপযুক্ত নেতা খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম আব্দুল মতিন চৌধুরীর দাপট ছিল ঈর্ষণীয়। বার্ধক্যজনিত কারণে এখানে ঘাঁটির সৃষ্টি করেন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। ১/১১-র প্রেক্ষাপটে একাধিক মামলার আসামী হয়ে তৈমূর আলম জেলহাজতে থাকায় ২০০৮’র নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হয় জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামানকে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীনের পর এখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে জয়-পরাজয়ে ব্যবধান ছিল ১০ হাজার ভোটের। কিন্তু কাজী মনিরুজ্জামান সকল রেকর্ড ভেঙে ৭৭ হাজার ভোটে পরাজিত হন। শুরু হয় রূপগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে ধ্বস। বিভিন্ন সময় দল পরিবর্তন, জেলা বিএনপির দায়িত্ব পেয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠনে স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়করণ করায় দিনদিন বিএনপির রাজনীতিতে ধ্বস নামে। বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
এদিকে ক্রান্তিকালে এসে রূপগঞ্জ বিএনপির হাল ধরেন রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও গাউছিয়া গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু। তিনি রাজনীতিতে আসার পর রূপগঞ্জের তৃণমূল বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা তাকে গ্রহণ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই রূপগঞ্জে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। দলের নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে থেকে খোঁজখবর নেয়া থেকে শুরু করে সংগঠন শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন। এখন রূপগঞ্জ বিএনপি ও এর সহযোগি সংগঠনের অভিভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। রূপগঞ্জবাসী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপুকেই বেছে নিয়েছেন। এছাড়াও এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার ও কাজী মনিরুজ্জামান।
রূপগঞ্জ আসনে মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু ও তৈমূর আলম খন্দকার একমঞ্চে ওঠে দলীয় কর্মসূচি পালন করলেও কাজী মনিরুজ্জামান সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি একগুয়েমি রাজনীতি করায় তার পক্ষের অনেক নেতাই ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন।
রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৯৬ সালের পর এখানে বিএনপির প্রকাশ্যে কোনো সম্মেলন হয়নি। সর্বশেষ ২০০৫ সালে কাজী মনিরুজ্জামান তার নিজস্ব মালিকানাধীন ম্যাক্স স্যুয়েটার গার্মেন্টস এ বসে পকেটে কমিটি করেছেন। যার কারণে রূপগঞ্জে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু বলেন, বিএনপির দুর্দিনে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রেখে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছি। দল করতে গিয়ে সরকারী দলের পেটুয়া পুলিশ বাহিনীর দায়ের করা ১১-১২টি মামলার আসামি হয়েছি। দলের ত্যাগী শতশত নেতাকর্মী হামলা, মামলার শিকার হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমার একমাত্র অভিভাবক খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। তবে দলের কারো সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, দলের দুর্দিন দেখে অনেকেই দল ত্যাগ করেছে। কেউ স্বেচ্ছায় দল ত্যাগ করলে কিছু করার নেই। তাছাড়া বড় দলে গ্র“পিং থাকবে এটা স্বাভাবিক।
অপরদিকে, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, দলের জন্য বহু মামলা, হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আড়াই বছর হাজতবাস করেছি। দলকে সু-সংঠিত করতে কাজ করছি। দল অবশ্যই মূল্যায়ন করবে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের জন্য রাজপথে আছি ও আগামীতেও থাকবো।
জামায়াত: এদিকে, জামায়াত ইসলাম প্রকাশ্যে দলীয় কর্মসূচি পালন না করলেও গোপনে তারা ঐক্যবদ্ধ আছে। তবে জামায়াতের দলীয় কার্যালয় না থাকায় দলীয় কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। গত ৫-৬ বছরের মধ্যে প্রকাশ্যে তারা কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি। হামলা, মামলার ভয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন, দেশের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে হয়তো এসব নেতাকর্মীরা দেশে ফিরবেন। মূলত জাামায়ত মাঠে কোণঠাসায় রয়েছে। তবে ভেতরে ভেতরে দলের সাংগঠনিক শক্তিশালী মজবুত করার চেষ্টা করছেন বলেও জানা গেছে।
জাতীয় পার্টি: এখানে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে এই আসনে মনোনয়ন পান জয়নাল আবেদীন। কিন্তু জাতীয়পার্টির নেতা জয়নাল আবেদীন ও আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শওকত আলীকে পরাজিত করে ১ লাখ ভোটের ব্যবধানে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজী (বীর প্রতিক)।
মাঠে জাপার সাংগঠনিক কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের রূপগঞ্জ উপজেলা জাপার সভাপতি আনোয়ার হোসেন জানান, মাঠে আছি এবং থাকব। দলের সাংগঠনিক শক্তি আগের চেয়ে ভালো। সম্প্রতি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিরোধে উপজেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক এমএ হাসানকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। তবে কোথাও দলীয় কর্মসূচি ও সভা সমাবেশ হয়েছে এমন সংবাদের খবর নেই গত ২ বছরেও।
এছাড়াও এখানে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ, ইসলামী আন্দোলনসহ সমমনা দলগুলোর কোনো কর্মসূচি ও কার্যালয়ও নেই।