সৌদি ফেরৎ নির্যাতিত ঝুমুর অবশেষে পেলেন তার পারিশ্রমিক

0
62
সৌদি ফেরৎ নির্যাতিত ঝুমুর অবশেষে পেলেন তার পারিশ্রমিক

নিজস্ব প্রতিবেদক : নিজ পরিশ্রমের অর্থ ফিরে পেলেন সৌদি থেকে ফেরত আসা গৃহ শ্রমিক ঝুমুর বেগম। ২০১৭ সালে মেসার্স ফ্যালকন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গৃহ শ্রমিকের কাজে পাড়ি জমানো ঝুমুর নির্যাতনের শিকার হয়ে নানা কাঠখর পেরিয়ে দেশে ফিরেছিলেন গত ১৮ অক্টোবর। এরপর গত ৬ জানুয়ারি তার হাতে পারিশ্রমিকের ৭০ হাজার টাকা তুলে দেয় এজেন্সি কতৃপক্ষ।

জানা গেছে, মেসার্স ফ্যালকন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির মাধ্যমে গৃহশ্রমিকের কাজে সৌদি আরব গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন রাজধানীর মগবাজার রেললাইন এলাকার বিধবা ২ শিশু সন্তানের জননি ঝুমুর বেগম। সেখানে যাবার পর শুরু হয় তার উপর অমানুসিক নির্যাতন। গৃহকর্তার দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে ঝুমুর বাড়ির ২তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে তাদের হাত থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে। আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে পূনরায় সেখানে নিয়ে গৃহকর্তা আরো নির্যাতন চালায়। এতকিছুর পরেও মাস শেষে তার পরিশ্রমের বেতনের টাকা দেয়া হয়নি তাকে। ওইদিকে ভাগ্যোন্নয়নে বিদেশে পাড়ি জমালেও বাংলাদেশে পিতৃ-মাতৃহীন অবস্থায় আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে যাওয়া ২ শিশু সন্তানের লেখাপড়া, থাকা-খাওয়ার খরচ পাঠাতে না পারার ব্যর্থতা ঝুমুরকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। বেতনের টাকা চাইলেই মালিক বলেন, তোকে বাংলাদেশ থেকে অনেক টাকা দিয়ে কিনে এনেছি। তোকে আর কোনো টাকা কেনো দিব? সব মিলিয়ে নির্যাতনের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে ঝুমুর সেখান থেকে পালিয়ে স্থানীয় হামেল থানায়(কুয়েত বর্ডারের কাছাকাছি) গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে গিয়েও গৃহকর্তা ও সৌদি পুলিশের দ্বারা অপমান-অপদস্ত ও নির্যাতনের শিকার হতে হয় মাত্র ২৬ বছরের এই অসহায় নারীকে। এক পর্যায়ে অনেক কাঠখর পেরিয়ে সেখানকার হামেল থানায় থাকা অবস্থাতেই সন্ধান পায় বাংলাদেশে থাকা সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী সোনিয়া দেওয়ান প্রীতির। যিনি ইতিমধ্যেই সৌদিতে গৃহশ্রমিকের কাজে এসে বিপদগ্রস্ত নারীদের উদ্ধারে এবং তাদের অধিকারের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। কয়েকদিন চেষ্টা চালিয়ে অবশেষে যোগাযোগ হয় তার সাথে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার কাছে ফোনে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন ঝুমুর বেগম। আরো জানান তার মতো কতজন নারী এই থানায় এমন বন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। শুরু হয় ঝুমুর সহ ওই সকল নারীদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার নানা চেষ্টা। বিপদগ্রস্ত প্রতিটি নারীর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে তাদেরকে সাথে নিয়ে সৌদিতে বাংলাদেশি দূতাবাস কর্মকর্তা থেকে শুরু করে দেশে প্রবাসী কল্যান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি-কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং এজেন্সি কতৃপক্ষ সহ প্রতিটি সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করা হয়। করা হয় তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন। সোনিয়া দেওয়ান প্রীতির নেতৃত্বে সেই মানববন্ধনে প্রতিটি নারীর পরিবারের পাশাপাশি একাত্মতা প্রকাশ করে উপস্থিত হোন বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের স্বনামধন্য চিত্রপরিচালক ছটকু আহমেদ থেকে শুরু করে রাজনীতিক, শিল্পী, নাট্যকার, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও চলচ্চিত্রাঙ্গনের স্বনামধন্য অনেকে সহ অসংখ্য পেশার মানুষ। খবরটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে এরপর দূতাবাসের সহযোগিতায় তাদেরকে এক এক করে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। ঝুমুরও ফিরে আসে গত ১৮ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে।

দেশে ফেরার পর ঝুমুর সহ তাদের মধ্যে কয়েকজন অসহায় প্রবাস ফেরত নারীদের হাতে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে নিজ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকির অনুষ্ঠানে ১টি করে সেলাই মেশিন তুলে দেন সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি। যে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দিপু মনি।

তবে সেলাই মেশিনের কাজ না জানা পিতৃ-মাতৃহীন এমনকি স্বামীহারা এতিম অসহায় ঝুমুরের পক্ষে ২ মেধাবী সন্তানের শিক্ষা ও ভরণ পোষন করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না দেখে সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি উদ্যোগ নেয় সৌদিতে তার পরিশ্রমের প্রায় ৮ মাসের বকেয়া থাকা বেতনের টাকা এজেন্সি কতৃপক্ষের থেকে উদ্ধার করে দেয়ার জন্য। সে জনশক্তি-কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বরাবর সেই এজেন্সির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পরামর্শ দেয় এবং সার্বক্ষণিক ঝুমুরের পাশে থাকে। সবশেষ গত ৬ জানুয়ারি জনশক্তি-কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সাথে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি যৌথ আলোচনার মাধ্যমে এজেন্সি কতৃপক্ষের থেকে নগদ ৭০ হাজার টাকা আদায় করে ঝুমুর ও তার সন্তানদের হাতে তুলে দেয়।

এই অর্থ দিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করবে বলে জানায় ঝুমুর। ঝুমুর বলেন, কখনো ভাবিনি যে আমি আবার বাংলাদেশে ফিরতে পারব, আমার ২ সন্তানকে বুকে নিতে পারব। প্রীতি আপার খোঁজ না পেলে হয়ত দেশেই ফিরতে পারতাম না। এরপর সৌদি যাবার পর দীর্ঘ ১১ মাসের মধ্যে দীর্ঘ ৮ মাসের কোনো পারিশ্রমিক পাইনি। দেশে ফিরে আমি সম্পূর্ণভাবে বেকার হয়ে পড়েছিলাম। ছেলে মেয়ে নিয়ে বোনের বাসায় আশ্রয়ে কতদিন থাকা যায়। এমন অবস্থায় প্রীতি আপা আমাকে আশ্বাস দেয় যে- আমি একটু সাহসি হলেই এবার আমার বেতনের টাকাও ফেরত পেতে পারি। তার সহযোগিতায়ই আজকে এই কষ্টের টাকাগুলো আমি ও আমার ২ সন্তান ফিরে পেলাম।

সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী সোনিয়া দেওয়ান প্রীতি বলেছেন, আলহামদুলিল্লাহ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঝুমুর ও তার পরিবারের পাশে থাকতে পেরেছি। গত ৬ জানুয়ারি জনশক্তি-কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে ৪ পক্ষের এক বৈঠকে বসে একের পর এক তারিখ দেয়ার মতো অবস্থায় আমি তাৎক্ষণিক ভাবে সমঝোতার মাধ্যমে আজ এবং এক্ষুনি বকেয়া বেতনের ৭০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রস্তাব পেষ করি। যা শেষ মুহুর্তে উভয় পক্ষ মেনে নেয়। মহান আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া যে তিনি আমাকে এই নেক কাজের অংশিদার করেছেন।

তিনি বলেন, শুধু ঝুমুর নয়, যে কোনো নারী-পুরুষ এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে কোনো কারণে বেতন না পেলে তারা প্রবাস থেকে দেশে ফিরে তাদের সেই পরিশ্রমের অর্থ ফিরে পাওয়ার জন্য জনশক্তি-কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বরাবর লিখিত অভিযোগ জানালে তারা তাদের সেই অর্থ ফিরে পাবেন। এর জন্য দরকার নিজ অধিকার আদায়ে স্ব স্ব এজেন্সির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে শুধু একটু সাহস।