মানব জমিন রিপোর্ট : হঠাৎ অস্থির নারায়ণগঞ্জ

0
318
মানব জমিন রিপোর্ট : হঠাৎ অস্থির নারায়ণগঞ্জ

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ থেকে : হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ। শহরে পুলিশের ব্যাপক তৎপরতার সঙ্গে জলকামান ও সাঁজোয়া যানের মহড়া চলছে গত দুইদিন ধরে। এতে একদিকে সাধারণদের মধ্যে আতঙ্ক অন্যদিকে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। নগরবাসীর মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কী হচ্ছে? কী হবে? অথচ নারায়ণগঞ্জে সরকারবিরোধী কোনো মিছিল মিটিং বা আন্দোলন নেই। নেই সরকারবিরোধী নেতাকর্মীদের চোখে লাগার মতো কোনো তৎপরতা। গতকাল দুপুরে শহরের চাষাঢ়া গোলচত্বরে খাজা মার্কেটের সামনে পুলিশের সাঁজোয়া যান ও জলকামান অবস্থান করতে দেখা গেছে।

যদিও গত কয়েক দিনে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজামের বিরুদ্ধে ওসির জিডি, আবার ওই ওসির বদলি, শামীম ওসমান অনুসারী কয়েকজন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতার মোবাইলের ভয়েস রেকর্ডিংয়ের অভিযোগ, বাংলাদেশ পর্যটক করপোরেশনের লিজকৃত পাগলা মেরি এন্ডারসনে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে ৬৮ জন আটক ও বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি মদ উদ্ধার এবং মাদকের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যবসায়ী নেতা তানভীর আহমেদ টিটুর নাম প্রকাশ করায় পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে।

ফলে নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ টিটুকে মাদক ব্যবসায়ীর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করে পুলিশের দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা পুলিশ প্রশাসন ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের নেতৃত্বে ৪৯টি ব্যবসায়ী সংগঠন মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। বুধবার বিকালে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স ভবনে ৯টি জাতীয়, ৩৩টি জেলা ভিত্তিকসহ মোট ৪৯টি ব্যবসায়ী সংগঠন পুলিশের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে প্রতিবাদ সভা করেছে।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আগামী রোববার এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। এর আগে মঙ্গলবার রাতে এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের জরুরি সভায় চেম্বারের তিনবারের পরিচালক তানভীর আহমেদ টিটুকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করে তার সুনাম নষ্ট করার অপচেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়ে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছিল।

এদিকে ব্যবসায়ী সংগঠনের এ ধরনের আল্টিমেটামের উত্তর দিতে প্রস্তুত ছিল পুলিশ প্রশাসনও। বুধবার বিকালে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজে যখন ৪৯টি ব্যবসায়ী সংগঠনের সভা চলছিল, তখন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে নগরের চাষাঢ়া এলাকায় মহড়া দেয় পুলিশ। সেই সঙ্গে চাষাঢ়া এলাকায় যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছিল পুলিশের সাঁজোয়া যান এবং জলকামান। মহড়া শেষে পুলিশ সুপার একটি বিশাল গাড়ির বহর নিয়ে তার কার্যালয়ে ফিরে যান। তার গাড়ির বহরে ৪টি হাইএস মাইক্রোবাস, ৬টি পুলিশ ভ্যান এবং একটি অ্যাম্বুলেন্স দেখা গেছে।

অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজলের সভাপতিত্বে ব্যবসায়ী সংগঠনের সভায় উপস্থিত ছিলেন, বিকেএমইএ, বাংলাদেশ হোসিয়ারি সমিতি, ইয়ার্ন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, ক্লথ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, নিটিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ ৪৯টি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল বলেন, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ সভায় সিদ্ধান্ত নেন যে, আগামী রোববার তানভীর আহমেদ টিটুর মতো একজন ক্রীড়া সংগঠক ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে পুলিশ একজন বার ব্যবসায়ীর সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে তার সুনাম নষ্টের ব্যর্থ চেষ্টায় লিপ্ত।

পুলিশের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতেই তারা আগামী রোববার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়ে এ ধরনের ঘটনার প্রতিকার চাইবেন। এছাড়া পুলিশ নারায়ণগঞ্জে এখন অভিনবপন্থায় চাঁদাবাজি শুরু করেছে কথিত চা এর দাওয়াত দিয়ে। আবার কারও কারও কাছ থেকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা চাইছে পুলিশ। তাই আমরা বলতে চাই, ‘দেখা করার দিন শেষ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’।

অপরদিকে মহড়া শেষে পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ তার কার্যালয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বুধবার সকাল থেকে শহরে সাঁজোয়া যান রাখা কিংবা জলকামান রাখা এটা আসলে নতুন কিছু নয়। হয়তো আগে লক্ষ্য করেন নাই আজকে লক্ষ্য করেছেন। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। মেরি এন্ডারসনে অভিযান হয়েছে সেখানে ৬৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। সদর থানায় জুয়ার আসরে আমরা অভিযান করেছি। সেখানে অনেককে গ্রেপ্তার করেছি। আমাদের পরিষ্কার কথা অপরাধী জুয়া, মদের ব্যবসা, তেল চুরি, বালু চুরির সঙ্গে জড়িত কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেব না। যেই করুক কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। যত প্রভাবশালী হোক কোনো ছাড় দেয়া হবে না।’

ওদিকে গত ২৭শে মার্চ বিকালে ফতুল্লার কুতুবপুরে সিসিলি নামে একটি কমিউনিটি সেন্টারে একটি নিউজ পোর্টাল কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম তার বক্তব্যে ‘শামীম ওসমানের মতো নেতা থাকলে  নারায়ণগঞ্জে প্রশাসনের দরকার হয় না’ বলে মন্তব্য করেন। শাহ নিজাম বলেন, ‘শামীম ওসমানের মতো নেতৃত্ব থাকলে প্রশাসনের প্রয়োজনও পড়ে না। কারণ শামীম ওসমান মাদক, সন্ত্রাস, ভূমিদস্যুর বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছেন।’ পরদিন ২৮শে মার্চ নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকায় ‘শামীম ওসমানের মতো নেতা থাকলে প্রশাসনের দরকার হয় না’ এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর শাহ নিজামের বিরুদ্ধে ২৯শে মার্চ বিকালে জিডি করেন ফতুল্লা মডেল থানার ওসি শাহ মঞ্জুর কাদের। জিডি নম্বর-১৫৭৯। এরপর ৩১শে মার্চ ওসি মঞ্জুর কাদেরকে ঢাকা এসবিতে বদলি করা হয়।

এছাড়া অভিযোগ উঠে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সভাপতি ও নাসিক প্যানেল মেয়র-২ মতিউর রহমান মতি, মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনুসহ বেশ কয়েকজন শামীম ওসমান অনুসারী নেতার মোবাইলে ভয়েস রেকর্ডিংয়ের অভিযোগ উঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।

এদিকে পুলিশের মহড়ার মধ্যদিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠন ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদের দূরুত্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে নগরবাসীর মাঝে। একাধিক সূত্রমতে, শামীম ওসমান আগামীকাল শনিবার বিকালে দলীয় নেতাকর্মীদের এক বিশেষ সভা ডেকেছেন। সেখানে তিনি পরবর্তী দিকনির্দেশনা দেবেন নেতাকর্মীদের। অন্যদিকে জেলা পুলিশও অনেকটা হার্ডলাইনে অবস্থান নিয়েছে। মোটকথা, সবকিছু মিলিয়ে হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি। তবে এর শেষ কোথায় তা দেখার অপেক্ষায় নারায়ণগঞ্জবাসী। তথ্য সূত্র : মানব জমিন